*পুষ্টিহীন ক্যালোরির আধুনিক ফাঁদ* শুভ্রা ব্যানার্জী, শিক্ষিকা,বেলতলা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (উঃ মাঃ)

*পুষ্টিহীন ক্যালোরির আধুনিক ফাঁদ*
শুভ্রা ব্যানার্জী, শিক্ষিকা,বেলতলা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (উঃ মাঃ)

 

বর্তমান যুগে আমরা অনেকেই পুষ্টিহীন ক্যালোরির ফাঁদে আসক্ত যা উচ্চক্যালোরি সরবরাহ করলেও, মানবদেহের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের (প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ লবণ, ফাইটোকেমিক্যালস, ফাইবার ইত্যাদি) ঘাটতি সৃষ্টি করে। এই ধরনের খাবার কে “EMPTY CALORIES” বা জাঙ্ক ফুড বলে। এই ধরনের খাবার শরীরকে শক্তি দিলেও, সুস্থতা ও পুষ্টির ক্ষেত্রে কোন ইতিবাচক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে না। জাঙ্ক ফুডে থাকে অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি, লবণ,স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং পরিশোধিত শর্করা । যা নিয়মিত গ্রহণ করলে স্থূলতা বাড়ে, ডায়াবেটিস ঝুঁকি বাড়ে, হজম শক্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমাগত কমতে থাকে। এই ধরনের খাবারের প্রতি অধিকাংশ মানুষ আসক্ত হয় কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় আনন্দদায়ক অনুভূতি খুঁজতে আমাদের উৎসাহিত করে। যখন জাঙ্ক ফুড বা অন্যান্য সুস্বাদু খাবার আমরা গ্রহণ করি তখন মস্তিষ্ক “ডোপামিন” নামে এক ধরনের রাসায়নিক নিঃসরণ করে যা মস্তিষ্কে আনন্দ অনুভূতি আনে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্ক আরো বেশি ডোপামিন রিসেপ্টর তৈরি করে । এই ধরনের আসক্তি মাদক বা অ্যালকোহলে আসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। তাই সময়ের সাথে সাথে কিছু নির্দিষ্ট খাবারের প্রতি আমরা আসক্তি অনুভব করি। একটু সচেতনতার জন্য আলোচনায় আসি জাঙ্কফুড কিভাবে আমাদের ক্ষতি করছে – জাঙ্কফুডে প্রচুর ক্যালোরি থাকলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবার থাকে না তাই পেট ভরলেও শরীর কিন্তু সঠিক পুষ্টি পায় না। সাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট থাকে যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা যায়। জাঙ্কফুডকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং স্বাদ বাড়াতে প্রচুর লবণ ব্যবহার করা হয় – যা উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ । দীর্ঘমেয়াদী বিষন্নতা, শারীরিক ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাব ধীরে ধীরে গ্রাস করে।

সব ‘ফাস্ট ফুড’ কি জাঙ্ক ফুড?
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব খাবারকে সরাসরি জাঙ্ক ফুড বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, হ্যামবার্গার বা টাকো—এই খাবারগুলি স্বাস্থ্যকর বা জাঙ্ক, দুই ধরনেরই হতে পারে। এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে—‏
ব্যবহৃত উপকরণের মান,
রান্নার পদ্ধতি ও
প্রক্রিয়াকরণের মাত্রা এর উপর।

যদি তাজা শাকসবজি, কম তেল এবং সম্পূর্ণ শস্য ব্যবহার করা হয়, তবে সেই একই খাবার স্বাস্থ্যকর হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত (highly processed) হলে তা জাঙ্ক ফুডে পরিণত হয়।

সাধারণত যে সব খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য কারখানায় তৈরি হয় এবং এতে কৃত্রিম স্বাদ, রং ও সংরক্ষক ব্যবহার করা হয়, সেগুলি জাঙ্ক ফুডের আওতায় পড়ে। উদাহরণস্বরূপ—
চিনি বা হাই ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপযুক্ত ব্রেকফাস্ট cereals,
সাদা ময়দা বা পরিশোধিত ভুট্টা দিয়ে তৈরি খাবার।
এই খাবারগুলি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও পুষ্টিগুণ অত্যন্ত কম।

যুক্তরাজ্যের Advertising Standards Authority (ASA) খাদ্যের পুষ্টিমান নির্ধারণে একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যাকে বলা হয় nutrient profiling। এই পদ্ধতিতে—
“A” শ্রেণির উপাদান: শক্তি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি ও সোডিয়াম

“C” শ্রেণির উপাদান: ফল, শাকসবজি, আঁশ ও প্রোটিন

এই দুই শ্রেণির স্কোরের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে খাবারকে HFSS (High Fat, Salt and Sugar) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা কার্যত জাঙ্ক ফুডেরই আরেক নাম।

অন্যদিকে, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে জাঙ্ক ফুড নির্ধারণে শুধু পুষ্টিমান নয়, বরং খাবার কতটা প্রক্রিয়াজাত (processed বা ultra-processed)—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে বোঝা যাবে কোনো খাবার ‘জাঙ্ক ফুড’ কি না?
আমাদের চারপাশের অনেক খাবারই তাদের প্রাকৃতিক বা আসল অবস্থা থেকে পরিবর্তন করা হয়। কোনো খাবার গরম করা হলে, ক্যানে বা টিনজাত করা হলে অথবা লবণ মাখানো হলেই যে তা জাঙ্ক ফুড হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়।
* প্রক্রিয়াজাত খাবার (Processed Food)*
যেমন হিমায়িত (frozen) বা টিনজাত শাকসবজি। এগুলো প্রক্রিয়াজাত হলেও অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হতে পারে।

* চেনার উপায়: কোনো খাবারকে ‘আল্ট্রা-প্রসেসড’ (Ultra-processed) বা ক্ষতিকর জাঙ্ক ফুড হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে প্যাকেটের গায়ে নিচের উপাদানগুলো আছে কি না দেখুন:
* কৃত্রিম রং (Colours)
* কৃত্রিম স্বাদ (Flavours)
* ইমালসিফায়ার (Emulsifiers)

কীভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেবেন?

স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার প্রধান উপায় হলো খাবারটিতে কী কী উপাদান আছে তা জানা। প্যাকেটের পেছনের পুষ্টি বিষয়ক তথ্য (Nutrition Information) পড়লে আপনি ওই খাবারের পুষ্টিগুণ বুঝতে পারবেন।
সাধারণত খাবারের লেবেলে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবারে নিচের উপাদানগুলোর পরিমাণ দেওয়া থাকে:
* শক্তি (Energy): যা ক্যালরি বা কিলোজুল হিসেবে দেখানো হয়।
* প্রোটিন (Protein): শরীরের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়।
* ফ্যাট (Fat): চর্বির পরিমাণ।
* কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrate): শর্করা।
* চিনি (Sugars): বাড়তি চিনির পরিমাণ বোঝার জন্য এটি জরুরি।
* ফাইবার (Fibre): হজমে সাহায্য করে এমন আঁশ।
* সোডিয়াম (Sodium): অর্থাৎ লবণের পরিমাণ।

যখনই কোনো প্যাকেটজাত খাবার কিনবেন, সবসময় প্যাকেটের পেছনের লেবেলটি খেয়াল করবেন। বিশেষ করে চিনি এবং সোডিয়াম (লবণ) এর পরিমাণ কম থাকলে এবং ফাইবার ও প্রোটিন বেশি থাকলে সেই খাবারটি তুলনামূলক বেশি স্বাস্থ্যকর।

 

আধুনিক ব্যস্ত জীবনে জাঙ্ক ফুড আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে স্বাদ ও সুবিধার মোহে পড়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ক্ষতি উপেক্ষা করা উচিত নয়। সচেতন খাদ্যাভ্যাস, কম প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং প্রাকৃতিক উপাদানের দিকে ঝোঁকই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।

Related Articles

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন বিশিষ্ট অফিসার যিনি তার সাহসী নেতৃত্ব, কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে সামরিক ক্ষেত্রে অনেক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছেন।…

🌸 রেইনবো ভাইবস: তোমার মনের আকাশ থাকুক মেঘমুক্ত! 🌈

🌸 রেইনবো ভাইবস: তোমার মনের আকাশ থাকুক মেঘমুক্ত! 🌈 হ্যালো প্রিয় সিসটার্স! 🙋‍♀️ কৈশোর মানেই তো এক মুঠো রোদ, এক আকাশ স্বপ্ন আর অনেকটা পাগলামি। কিন্তু কখনো…

শীর্ষে থাকার জন্য পরীক্ষার ঠিক ২ দিন আগের মাস্টার প্ল্যান! 🚀✨

শীর্ষে থাকার জন্য পরীক্ষার ঠিক ২ দিন আগের মাস্টার প্ল্যান! 🚀   ১. 🧠 রিভিশন স্ট্র্যাটেজি (স্মার্ট রিভিশন) এই সময়ে বইয়ের লাইন বাই লাইন না…