ভারতে বিস্কুট প্যাকেটের প্রতি পাঁচটির চারটিতেই কৃত্রিম ফ্লেভার ও পাম তেল

ভারতে বিস্কুট প্যাকেটের প্রতি পাঁচটির চারটিতেই কৃত্রিম ফ্লেভার ও পাম তেল

 

আপনি দোকান থেকে ডাইজেস্টিভ কিনে আনলেন। প্যাকেটের গায়ে লেখা: ‘হাই ফাইবার’। লেখা রয়েছে ‘মাল্টিগ্রেন’ও। দেখে আপনি নিশ্চিন্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি পাঁচটি বিস্কুটের মধ্যে চারটিতেই রয়েছে কৃত্রিম ‘ফ্লেভার’। তবে সেই তথ্য প্যাকেটের গায়ে একেবারে ছোট হরফে লেখা থাকে। খুব খেয়াল না করলে চোখে পড়বে না।

ন্যাটফার্স্টের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ভারতে প্রায় ২ হাজার ১১২ ধরনের বিস্কুট বিক্রি হয়। এর মধ্যে প্রতি পাঁচটির চারটিতেই কৃত্রিম ফ্লেভার বা স্বাদ এবং পাম তেল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি প্রতি চারটির তিনটিতে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ময়দা বা রিফাইন্ড ময়দা।

প্যাকেটজাত খাবার নিয়ে কাজ করে ন্যাটফার্স্ট। ‘ট্রুথইন’ অ্যাপের মাধ্যমে ১৩ লক্ষ প্রোডাক্ট স্ক্যান ও বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্ট তৈরি করেছে তারা। এই সমীক্ষায় ২৫টি খাদ্য-পণ্যের ২৩ হাজার রকমের ভ্যারাইটির তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। ‘ট্রুথইন’ রেটিং সিস্টেমে ০ থেকে ৫-এর স্কেলে খাবারের মান নির্ধারণ করা হয়। এই মূল্যায়নে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়: খাদ্যের পুষ্টিগুণ, উপাদানের মান এবং কতটা প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই), ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ নিউট্রিশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকাকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। সমীক্ষা বলছে, বিস্কুট বিভাগে সামগ্রিক স্কোর ছিল ০.৭থেকে ১.৯-এর মধ্যে। এই স্কেলে ২-এর নিচে থাকা পণ্যকে

বিস্কুট হোক বা অন্য প্যাকেটজাত পণ্য ক্রয়ের সময় ক’জনই আর লেবেলের লেখা খুঁটিয়ে পড়েন! বেশিরভাগ মানুষই শুধু এক্সপায়ারি ডেট দেখে ছেড়ে দেন। অথচ এই প্যাকেটজাত খাবারে অনেক বিপদ লুকিয়ে আছে। যেমন বেশিরভাগ বিস্কুটে চিনি ও কৃত্রিম ফ্লেবারের বেশি মাত্রায় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে এক সমীক্ষায়।

 

সন্তানের টিফিনের বিস্কুট নিয়েও প্রশ্ন??

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, স্যান্ডউইচ বিস্কুটের স্কোর মাত্র ০.৭ এবং ফিল্ড বিস্কুটের স্কোর ০.৮। স্যান্ডউইচ বিস্কুটের ৯৯ শতাংশেই অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে। ৮৮ শতাংশে অতিরিক্ত চিনি নির্ধারিত সীমার উপরে। ১০০ শতাংশ পণ্যে কোনও না কোনও অ্যাডিটিভব্যবহার করা হয়েছে এবং ৯২ শতাংশে রয়েছে কৃত্রিম ফ্লেভার। ফিল্ড বিস্কুটের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ছবি সামনে এসেছে। ৯৫ শতাংশে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৮৭ শতাংশে অতিরিক্ত চিনি এবং ৯৯ শতাংশে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডিটিভপাওয়া গিয়েছে।

বিভিন্ন খাদ্য বিভাগের মধ্যে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উচ্চ ফ্যাট, চিনি ও লবণযুক্ত উপাদান, কৃত্রিম ফ্লেভার এবং রং, এই সবকিছুই নিত্যদিনের খাবারে বারবার পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে যেগুলি শিশুরা বেশি খায়। তবে সমীক্ষায় কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা হয়নি। বরং পুরো বিভাগজুড়ে কী ধরনের প্রবণতা রয়েছে, সেটাই তুলে ধরা হয়েছে।

ন্যাটফার্স্টের সমীক্ষা::

ডাইজেস্টিভ বিস্কুটে ফাইবার আছে, কিন্তু চিনিও কম নেই। ডাইজেস্টিভ বিস্কুট এই বিভাগে সবচেয়ে বেশি স্কোর করেছে: ১.৯। সমীক্ষা অনুযায়ী, ডাইজেস্টিভ বিস্কুটের ৮০ শতাংশেরও বেশি পণ্যে পর্যাপ্ত খাদ্য-আঁশ বা ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশে মাঝারি মাত্রার প্রোটিনও পাওয়া যায়।

রবি তেজা পুত্রেভু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ভারতে এই প্রথম আমরা এমন একটি সুসংগঠিত এবং বৃহৎ ডেটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছি। ভারতীয় প্যাকেটজাত খাবারের ভিতরে আসলে কী রয়েছে, তা স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরছে এই সমীক্ষা। পুষ্টি সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য সবার নাগালের মধ্যে থাকা উচিত।’

কিন্তু পড়েন কতজন?

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ নিউট্রিশনের একটি সমীক্ষা বলছে, ৭৫.৪ শতাংশ ক্রেতা দাবি করেন যে তাঁরা খাবারের প্যাকেটের লেবেল পড়েন। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ১৪.৭ শতাংশ মানুষ উপাদানের তালিকা বা ইনগ্রিডিয়েন্টস খুঁটিয়ে দেখেন। অধিকাংশ মানুষ শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ দেখেই ক্ষান্ত হন। অনেকেই আবার শুধু ব্র্যান্ডের নাম দেখেই পণ্য কিনে ফেলেন।

প্যাকেটে সমস্ত তথ্য পরিষ্কার লেখা থাকে না। আসল প্রশ্ন হল, সাধারণ মানুষ সেই তথ্য কতটা বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।

বাড়ছে প্যাকেটজাত খাবারের উপর নির্ভরতা

সমীক্ষায় আরও দেখা গিয়েছে, ডাইজেস্টিভ বিস্কুটের ৮৮ শতাংশেই অতিরিক্ত চিনি নির্ধারিত সীমার উপরে রয়েছে। পাশাপাশি ৯৪ শতাংশ পণ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রাও অত্যন্ত বেশি।

হাউজহোল্ড কনজাম্পসান এক্সপেন্ডিচার সার্ভে ২০২২-২৩ অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতীয় পরিবারগুলির খাদ্য-ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশই যাচ্ছে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের পিছনে। গ্রামীণ পরিবারগুলিতে মাথাপিছু মাসিক খাদ্য-ব্যয়ের ৯.৮৪ শতাংশ এবং শহুরে পরিবারগুলিতে ১১.০৯ শতাংশ খরচ হচ্ছে এই ধরনের খাবারের পেছনে। অন্যদিকে, ইকনমিক সার্ভে ২০২৫-২৬ রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত বা আলট্রা-প্রসেসড খাবারের ব্যবহার ভারতে দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে স্থূলতার সমস্যা। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ‘টার্গেট’ করে তৈরি করা বিজ্ঞাপনকে এর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বিস্কুট বিভাগের তুলনামূলক ভাবে ‘ভালো’ স্কোর পাওয়া পণ্যগুলিও সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। কারণ কম পরিমাণে খেলেও অতিরিক্ত চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ক্যালোরি চলে আসে শরীরে। উল্লেখ্য, এই সমীক্ষার তথ্য ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বেরর মধ্যে গ্রাহকরা যে সব খাবার কিনেছেন সেগুলির প্রোডাক্ট লেবেল স্ক্যান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি কোনও ল্যাবরেটরির নিরীক্ষা, খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে সমীক্ষা বা ব্র্যান্ডের র‍্যাঙ্কিং রিপোর্ট নয়।

বিজ্ঞাপনে নয়, নজর দিন ভেতরের উপাদানে

গবেষকদের স্পষ্ট বক্তব্য, শুধু প্যাকেটের সামনের চটকদার দাবি, ক্যালোরির হিসেব বা ব্র্যান্ডের নাম দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। সুস্থ থাকতে পণ্য কেনার আগে প্যাকেটের উল্টো পিঠে থাকা উপকরণের তালিকা (Ingredient list) পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। কোন খাবারে কতটা কৃত্রিম ফ্লেভার, প্রিজারভেটিভ বা লুকানো চিনি আছে, তা না জেনে খাবার মুখে তোলা উচিত নয় ।

Related Articles

The Modern Trap of Empty Calories :: Subhra Banerjee

*পুষ্টিহীন ক্যালোরির আধুনিক ফাঁদ* শুভ্রা ব্যানার্জী, শিক্ষিকা,বেলতলা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (উঃ মাঃ)   বর্তমান যুগে আমরা অনেকেই পুষ্টিহীন ক্যালোরির ফাঁদে আসক্ত যা উচ্চক্যালোরি সরবরাহ করলেও,…

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন বিশিষ্ট অফিসার যিনি তার সাহসী নেতৃত্ব, কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে সামরিক ক্ষেত্রে অনেক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছেন।…

বিনিয়োগের প্রথম পাঠ: অনুষ্কা ও সোহিনির টাকার গল্প 

বিনিয়োগের প্রথম পাঠ: অনুষ্কা ও সোহিনির টাকার গল্প আমাদের গ্রামের স্কুলগুলোতে আমরা ইতিহাস, ভূগোল বা বিজ্ঞান মন দিয়ে পড়ি। কিন্তু যে জিনিসটা আমাদের জীবনকে প্রতিটি…