সম্পাদকীয়: এক অপরাজেয় রূপকথা—ডঃ বুশরা বানো ও বাংলার মেয়েদের ডানার উড়ান
সম্পাদকীয়: এক অপরাজেয় রূপকথা—ডঃ বুশরা বানো ও বাংলার মেয়েদের ডানার উড়ান
একটি মেয়ে, যার কোলে তখন সদ্যোজাত শিশু। শরীরে অস্ত্রোপচারের তীব্র যন্ত্রণা। চারপাশের চেনা সমাজ যখন ভাবছে—”মেয়েটির তো বিয়ে হয়ে গেছে, সন্তান হয়ে গেছে, এবার উনিশ-বিশের সাংসারিক অঙ্কে জীবনটা কেটে গেলেই হলো। সমস্ত শারীরিক কষ্টকে একপাশে সরিয়ে, একহাতে সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে অন্যহাতে তিনি উল্টে চলেছিলেন দেশের কঠিনতম পরীক্ষা ইউপিএসসি (UPSC)-র মোটা মোটা বইয়ের পাতা। তিনি ডঃ বুশরা বানো। আজ যিনি ইন্ডিয়ান police সার্ভিস (IPS) অফিসার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের খড়্গপুরের অ্যাডিশনাল এসপি (ASP)।
বুশরা বানোর এই গল্প কোনো রুপোলী পর্দার কাল্পনিক চিত্রনাট্য নয়, এটি এক চরম বাস্তব আর জেদের লড়াই। আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি (Ph.D.) করার পর তিনি সৌদি আরবের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছিলেন। জীবনটা বেশ আরামের, বিলাসবহুল আর গোছানো হতে পারত। কিন্তু তাঁর চোখে ছিল অন্য এক স্বপ্ন—দেশের মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার স্বপ্ন, খাকি উর্দিতে দেশসেবা করার জেদ। সেই লাখ টাকার আরামের চাকরি স্বেচ্ছায় ছেড়ে, গর্ভবতী অবস্থায় তিনি ভারতে ফিরে আসেন। যখন তাঁর প্রথম ইউপিএসসি-র ফল বেরোয়,তখন—তাঁর কোল আলো করে এসেছে সন্তান। সেই অবস্থাতেই সারা ভারতের মধ্যে ২৭৭ র্যাঙ্ক করে তিনি তাক লাগিয়ে দেন। পরবর্তীতে নিজের আইপিএস হওয়ার স্বপ্নপূরণের জন্য চরম ব্যস্ততা আর শারীরিক ক্লান্তি—সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেন এবং ২৪৩ র্যাঙ্ক নিয়ে আইপিএস অফিসার হয়ে দেখান।
উত্তরপ্রদেশের মহকুমা শাসক (SDM) থাকাকালীন তিনি যেভাবে বেআইনি খনি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে যে একটা মেয়ের মনের জোরের কাছে যেকোনো অপরাধী মাথা নত করতে বাধ্য।
বাংলার গ্রামীণ প্রান্তরে, মেঠো পথের ধারে, খড়ের চালের নিচে বা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বসে থাকা বোনদের বলছি—বুশরা বানোর এই জীবন থেকে আমাদের ৫টি বড় শিক্ষা নেওয়া উচিত:
* পরিস্থিতি কখনো অজুহাত হতে পারে না: আমরা অনেকেই বলি “আমার পড়ার জন্য আলাদা ঘর নেই”, “টাকা নেই” বা “সংসারের অনেক কাজ”। বুশরা বানো প্রমাণ করেছেন, কোলে ছোট বাচ্চা আর ভাঙা শরীর নিয়েও যদি ইউপিএসসি পাস করা যায়, তবে সঠিক ইচ্ছে থাকলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই লড়াই জেতা সম্ভব।
* বিয়ের পর স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় না: গ্রামীণ সমাজে একটা ভুল ধারণা আছে যে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে বা সন্তান হলে পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার শেষ। বুশরা এই মিথ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। বিয়ে তোমার জীবনের একটা সুন্দর অংশ মাত্র, তা কখনো তোমার মেধার ফুলস্টপ হতে পারে না।
* আরামের জীবন ছেড়ে লড়তে শেখো: সৌদি আরবের বিলাসবহুল প্রফেসরের চাকরি ছেড়ে বুশরা কঠিন লড়াইয়ের রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। জীবনে বড় কিছু করতে গেলে নিজের ‘কমফোর্ট জোন’ বা আরামের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে ঝুঁকি নিতেই হবে।
* ডিজিটাল সুযোগকে অস্ত্র বানাও: অভাবের জন্য যারা আজ পড়াশোনা বন্ধ করতে চলেছ, তারা মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটে ফ্রিতে পাওয়া অনলাইন সুযোগগুলোকে বিনোদনের বদলে নিজের পড়াশোনার হাতিয়ার বানাও। আজকের দিনে সঠিক দিশা থাকলে ঘরে বসেই পৃথিবী জয় করা সম্ভব।
* ‘লোকে কী বলবে’ তা ভাবা বন্ধ করো: তুমি যখন বড় স্বপ্ন দেখবে, চারপাশের মানুষ তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, নানা কথা শোনাবে। তাদের কথার উত্তর মুখে দিও না, তোমার নীরব পরিশ্রম আর চূড়ান্ত সাফল্য যেন তাদের মুখের ওপর মোক্ষম জবাব দেয়।
আজ বাংলার গ্রামে গ্রামে কত প্রতিভা লুকিয়ে আছে। কারোর চোখে হয়তো অফিসার হওয়ার স্বপ্ন, কেউ হয়তো বড় খেলোয়াড় হতে চাও, কেউবা শিক্ষিকা বা বিজ্ঞানী। কিন্তু ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয়ে তোমরা নিজেদের গুটিয়ে রাখো। মনে রেখো, সমাজ তোমাকে তখনই স্যালুট করবে যখন তুমি সফল হবে। ভাঙা ঘরে বসেও যে আকাশের চাঁদ ছোঁয়া যায়, আইপিএস বুশরা বানো তার জীবন্ত প্রমাণ।
শিক্ষা আর আত্মবিশ্বাসকে নিজের হাতিয়ার করো। তোমার চারপাশের পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, নিজের স্বপ্নের সাথে কখনো আপস কোরো না। আজ তুমি যে লড়াইটা লড়ছ, তা শুধু তোমার একার নয়; তোমার সাফল্য আগামী দিনে বাংলার আরও হাজারটা গ্রামীণ মেয়ের সাফল্যের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে তুমি । উঠে দাঁড়াও, নিজের ডানার ওপর ভরসা রাখো, কারণ এই আকাশটা আজ তোমার ওড়ার অপেক্ষায়।