প্রাচীন অভ্যাস, আধুনিক ঝুঁকি : তামার পাত্রের বাস্তবতা :: শুভ্রা ব্যানাজী
প্রাচীন অভ্যাস, আধুনিক ঝুঁকি : তামার পাত্রের বাস্তবতা
শুভ্রা ব্যানাজী
প্রচন্ড গরমে পারদ যখন ঊর্ধ্বমুখী, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি, ঘেমেনেয়ে আমরা সকলেই প্রায় নাজেহাল-এই অসহনীয় গরমে সুস্থ থাকার জন্য, ডিহাইড্রেশন, জ্বর, সর্দি-কাশি, মাথা ব্যাথা, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করার প্রবণতা আমাদের সবার মধ্যেই দেখা যায়।
কারণ অত্যাধিক গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পরিপোষকসহ জল বেরিয়ে যায়। আমরা জানি ঘাম একটি প্রয়োজনীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যা একদিকে যেমন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখে, অন্যদিকে শরীরের ক্ষতিকারক দুষিত পদার্থ গুলিকে শরীর থেকে বের করে শরীরকে সুস্থ রাখে। কিন্তু ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে নুন ও জল বেরিয়ে যায় সেই ঘাটটি পূরণ না হলে শরীরে দেখা যায় ডিহাইড্রেশন এবং সেখান থেকে একাধিক সমস্যা। এই সমস্যা আটকানোর জন্য সাধারণ পানীয় জলের পাশাপাশি আমরা ইলেক্ট্রোলাইট ওয়াটার, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ORS) বা বাড়িতে তৈরি নুন চিনি লেবুর জল অথবা গ্লুকোজের জল আমরা খেয়ে থাকি কারণ ঘামের মধ্যে দিয়ে শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় এলিমেন্টগুলি বেরিয়ে যায় যার ফলে শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আর সাম্প্রতিককালে প্রাচীন আয়ুর্বেদিক রীতির আদলে তামার পাত্রে জল রেখে জল পান করার প্রবণতা আমাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। মনে করা হয় যে তামার পাত্রে রাখা জল আমাদের হজম শক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে-কারণ কপার (Copper)/তামা আমাদের শরীরের জন্য একটি প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান যা অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে আমাদের শরীরে প্রয়োজন। তাই তামার পাত্রে জল রেখে পান করার অভ্যাস কিভাবে নিরাপদ ভাবে করা যায় সে সম্পর্কে আমাদের সবার জেনে রাখা খুব জরুরী। অতিরিক্ত বেশি পরিমাণে তামার পাত্রে জলপানের ক্ষতিকারক অনেক দিকও রয়েছে।শরীরে তামার মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেড়ে গেলে নানা রকম শারীরিক জটিলতা দেখা যায়।
কপার টক্সিসিটি বা তামার বিষাক্ততা: দীর্ঘ সময় তামার পাত্রে জল জমিয়ে রাখলে অতিরিক্ত মাত্রায় তামা দ্রবীভূত হয়। এই জল নিয়মিত পানে শরীরে তামার আধিক্য ঘটে। এর প্রাথমিক লক্ষণ হলো বমি বমি ভাব, বমি, তীব্র পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, মাথা ঘোরা এবং মুখে ধাতব স্বাদ পাওয়া।
হজম প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন: সামান্য পরিমাণ তামা হজমে সাহায্য করলেও এর অতিরিক্ত উপস্থিতি পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে বুকে জ্বালা জ্বালা বোধ, acidity এবং গ্যাস্ট্রাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
অ্যালার্জি ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া: অনেকের ক্ষেত্রে তামা থেকে ত্বকে অ্যালার্জি, চুলকানি বা ত্বকে rash দেখা দিতে পারে।
গর্ভবতী নারী এবং ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই জল পান করা উচিত নয়।
তামার পাত্রের গুণাগুণ যদি উপভোগ করতেই হয়, তবে তা করতে হবে বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে। যেমন:
১. তামার পাত্রে জল রাখার সময়সীমা: তামার পাত্রে জল সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি রাখা যাবে না। অনেকেই সারা রাত বা দিনের পর দিন তামার পাত্রে জল জমিয়ে রাখেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
২. পরিমাণে মিতব্যয়িতা: দিনে মাত্র ১ থেকে ২ গ্লাস তামার পাত্রে রাখা জল পান করাই যথেষ্ট। এর বেশি জল সাধারণ পাত্র বা কাঁচের পাত্র থেকে পান করুন।
৩. পাত্রের খাঁটিত্ব ও পরিচ্ছন্নতা: পাত্রটি যেন শতভাগ খাঁটি তামার হয়, কোনো কৃত্রিম প্রলেপ (Coating) যুক্ত না হয়। তামার পাত্র বাতাস ও জলের সংস্পর্শে দ্রুত অক্সিডেশন হয়। তাই পাত্রটি ভালো করে পরিষ্কার রাখতে হবে।
৪. শরীরের সংকেত বুঝুন: কপারের পাত্র থেকে পান করার পর যদি পেট ব্যথা বা বমি বমি ভাব হয়, তবে তৎক্ষণাৎ তা বন্ধ করতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে রক্তের কপার লেভেল পরীক্ষা করাতে হবে।
এবার যে বিষয়টি আমাদের সকলকেই সচেতন থাকতে হবে মনে রাখবেন ইলেকট্রোলাইট জল, ORS বা নুন চিনি লেবুর জল কখনোই তামার বোতলে সংরক্ষণ করা বা সংরক্ষণ করে সেখান থেকে পান করা উচিত নয়, কারণ এই সংমিশ্রণটি অত্যন্ত বিপদজনক।
ইলেক্ট্রোলাইট দ্রবণে সাধারণত থাকে বিভিন্ন খনিজ লবণ; যেমন সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম; এবং অনেক ক্ষেত্রে হালকা অ্যাসিড (যেমন সাইট্রিক অ্যাসিড, যা স্বাদ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়)।
এই লবণ ও অ্যাসিড তামার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে দ্রুত তামা ক্ষয় (corrosion) ঘটায় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অতিরিক্ত তামা জলে মিশে যায়। ওআরএস-এর মধ্যে লবণ, ইলেকট্রোলাইট এবং কখনও কখনও সামান্য অ্যাসিড (যেমন সাইট্রিক অ্যাসিড) থাকে। এগুলিও তামার সংস্পর্শে এলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং তামা গলে পানীয়ে মিশে যেতে পারে। এর ফলে দ্রবণের রং নীল বা সবুজাভ হয়ে যেতে পারে।
সাধারণ অম্লহীন, ঘরের তাপমাত্রার জল তামার পাত্রে ৬, ৮ ঘণ্টা রাখা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও, ইলেক্ট্রোলাইট জল মাত্র কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যেই বিপজ্জনক মাত্রায় তামা শোষণ করতে পারে।
তামার বোতলে সংরক্ষিত ইলেক্ট্রোলাইট জল পান করলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন তামা বিষক্রিয়া (Copper Toxicity), তীব্র পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, বমি ভাব, তীব্র পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া এবং পাকস্থলীর আস্তরণে জ্বালা বা ক্ষয়। তাই নিরাপদ ব্যবহারের জন্য ইলেক্ট্রোলাইট জল সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করুন খাদ্যমান-স্বীকৃত প্লাস্টিক, কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল।
কখনোই তামার বোতলে রাখবেন না ইলেক্ট্রোলাইট জল, লেবু জল, চিনিযুক্ত পানীয় বা গরম জল।
তামার পাত্রের উপকারিতা যেমন আছে, তেমনই ভুল ব্যবহারে এর ঝুঁকিও কম নয়। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এই বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামার বোতল শুধুমাত্র সাধারণ পানীয় জল রাখার জন্যই উপযুক্ত। ওআরএস বা অন্য কোনো লবণযুক্ত বা টক পানীয় এতে রাখা উচিত নয়।
ডিহাইড্রেশন বা ডায়রিয়ার সময় ওআরএস অত্যন্ত জরুরি। তবে সঠিক পাত্রে না রাখলে এই উপকারী পানীয়ই ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সচেতন থাকুন এবং নিরাপদ উপায়ে ওআরএস /ইলেকট্রোলাইট জল ব্যবহার করুন।
যদি কেউ ইতিমধ্যে তামার বোতলে রাখা ইলেক্ট্রোলাইট জল পান করে থাকেন এবং তীব্র পেটব্যথা, বমি বা অসুস্থতা অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।
তথ্যসূত্র: https-//www.healthline.com