দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ইন্টারনেটকে একটি ভার্চুয়াল খেলার মাঠ—বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বিতীয় বিশ্ব হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু আজ ডিজিটাল জগৎটাই আসল বাস্তবতা। এখানেই তরুণীরা পড়াশোনা করছে, ব্যবসা গড়ে তুলছে, নিজেদের কমিউনিটি তৈরি করছে এবং বিশ্বের দরবারে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছে। অথচ লক্ষ লক্ষ কিশোরী ও তরুণীর জন্য এই পরিবেশ আজ সম্ভাবনার মহাসড়ক থেকে বদলে গিয়ে এক চরম মানসিক উদ্বেগের মাইনফিল্ডে পরিণত হয়েছে। এআই-জেনারেটেড ডিপফেক (AI-generated deepfakes), অনুমতিহীন ছবি বিকৃতি (image morphing) এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধ যেভাবে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তাতে ডিজিটাল নিরাপত্তাকে আর কোনো বিলাসিতা বা নাগরিক সচেতনতার একটি সাধারণ অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তাকে এখন একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই হবে।
ভীষণ ভয়ংকর বাস্তবতা এটাই যে, সাধারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কিছু অসাধু চক্র মাত্র কয়েক মিনিটে একজন তরুণীর জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। রাশমিকা মান্দানার ভাইরাল ডিপফেক মামলার মতো হাই-প্রোফাইল ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে যে, ইন্টারনেটে বিনামূল্যে পাওয়া এআই টুলের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফিক বা আপত্তিকর ভিডিওতে অন্যের মুখ নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেওয়ার এই নোংরা মানসিকতা থেকে সেলিব্রিটিরাও রেহাই পাচ্ছেন না। তবে মিডিয়ার লাইমলাইটের বাইরে সাধারণ ঘরের মেয়েরা এই সংকটে আরও বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে।
বর্তমান সাইবার অপরাধীদের বাস্তব কার্যপদ্ধতি (modus operandi) লক্ষ্য করলে শিউরে উঠতে হয়। ভারতের বিভিন্ন মেট্রোপলিতন শহরের পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, অপরাধীরা ইনস্টাগ্রাম বা লিঙ্কডইন থেকে তরুণীদের সাধারণ পাবলিক প্রোফাইল পিকচার ডাউনলোড করে। এরপর জেনারেটিভ এআই (Generative AI) ব্যবহার করে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত যৌন উদ্দীপক বা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তৈরি করে তাদের সামাজিক সম্মান নষ্ট করার হুমকি দেয়। মফস্বল শহর বা গ্রামেও এই থাবা ছড়িয়ে পড়েছে—চিকমাগালুরুর একটি সাম্প্রতিক মামলায় দেখা গেছে, ব্ল্যাকমেইলাররা এআই দিয়ে বিকৃত করা একটি আপত্তিকর ভিডিও সরাসরি তরুণীর কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
একইভাবে, এই সাইবার অপরাধীরা এখন অনলাইন চাকরিদাতার ছদ্মবেশ ধারণ করছে। তারা দূরবর্তী চাকরির (Remote Jobs) প্রলোভন দেখিয়ে কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীদের সাধারণ “ভিডিও ভেরিফিকেশন কলে” ডাকে, সেখান থেকে কৌশলে স্ক্রিনশট নিয়ে পরে এআই টুলের মাধ্যমে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে আর্থিক ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। সমাজ কী ভাববে—এই ভয় এবং তীব্র সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এই তরুণ ভুক্তভোগীদের নীরব করে রাখে, যার ফলে তারা এক অন্তহীন অসহায়ত্বের চক্রে আটকা পড়ে যায়।
যদি কোনো বাস্তব স্কুল, পার্ক বা সামাজিক স্থান এতটা বিপজ্জনক হতো, তবে অভিভাবকরা বিদ্রোহ করতেন এবং প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধ করে দিত। তাহলে কেন আমরা অনলাইনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার এত নিম্নমান মুখ বুজে সহ্য করছি?
আগামী প্রজন্মের নারী নেতৃত্বকে ক্ষমতায়ন করতে হলে আমাদের আইনি ও ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। মেয়েদের শুধু “তোমার অ্যাকাউন্টটি ডিলিট করে দাও” বা “ট্রলদের উপেক্ষা করো” বলা বন্ধ করতে হবে—কারণ এটি কোনো সমাধান নয়, এটি এক ধরনের ডিজিটাল নির্বাসন। প্রকৃত ক্ষমতায়ন হলো তরুণীদের নিজস্ব ডিজিটাল সীমানা রক্ষা করার কার্যকর জ্ঞান দেওয়া। কীভাবে প্রাইভেসি সেটিংস লকডাউন করতে হয়, ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে কীভাবে অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখতে হয় এবং কীভাবে আধুনিক আইনি কাঠামোর কঠোর ব্যবহার করতে হয়, তা তাদের জানতে হবে।
আমাদের দেশে এই আইনি হাতিয়ারগুলো রয়েছে এবং সেগুলোর ব্যবহার করা শক্তির লক্ষণ, লজ্জার নয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর অধীনে ধারা ৭৮ সাইবার স্টকিং (Cyberstalking) এবং কোনো নারীর ইলেকট্রনিক যোগাযোগে অননুমোদিত নজরদারি চালানোকে কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। তাছাড়া, ইনফরমেশন টেকনোলজি (IT) অ্যাক্ট-এর ধারা ৬৬ই যেকোনো নারীর ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া ধারণ, বিকৃতি বা বিতরণ করাকে সম্পূর্ণ অপরাধ বলে ঘোষণা করে।
ভুক্তভোগীদের নীরবে ভোগার কোনো প্রয়োজন নেই। ভারত সরকার জাতীয় সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল (National Cyber Crime Reporting Portal) পরিচালনা করে, যেখানে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের জন্য একটি বিশেষ এবং সম্পূর্ণ গোপনীয় (Anonymous) রিপোর্টিং মডিউল রয়েছে। এছাড়া জাতীয় সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন ১৯৩০ (1930) নম্বরে কল করে ২৪/৭ যেকোনো সময় তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব, যেখানে ভুক্তভোগীরা ডিজিটাল অপব্যবহার, পরিচয় চুরি (Identity Theft) এবং ব্ল্যাকমেইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে সরাসরি পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ যদি ভয়ের কারণে ইন্টারনেটে নিজেদের গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হয়, তবে প্রকৃত লিঙ্গ সমতা কখনোই আসবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল অ্যান্টিভাইরাস সফ্টওয়্যার ইনস্টল করা বা পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা নয়; এটি হলো ইন্টারনেটের সামাজিক চুক্তিকে নতুন করে লেখা। সাইবার আইনকে সহজ ভাষায় ছড়িয়ে দিয়ে, অভিযোগ জানানোর ভয় ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করে এবং ডিজিটাল স্পেসকে আমাদের বাস্তব রাস্তার মতোই সুরক্ষিত ও দায়বদ্ধ করে তোলার মাধ্যমেই আমরা তরুণীদের সেই নিরাপদ ভিত্তি দিতে পারি, যা তাদের ভয়হীনভাবে লগ-ইন করতে, নিজের মতামত জানাতে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ দাবি করতে সাহায্য করবে।