নীরব জালের আড়ালে

নীরব জালের আড়ালে

অফিসের কাচের জানলা দিয়ে যখন দুপুরের চড়া আলো এসে পড়ছিল, মেঘা তখন নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা প্রেজেন্টেশন ফাইল গোছাতে ব্যস্ত। বাইরে থেকে দেখলে কর্পোরেট সেক্টরের এই ঝকঝকে পরিবেশটাকে নিখুঁত মনে হয়। মেঘা এসি-র ঠাণ্ডা ঘরে বসেও টের পাচ্ছিল, তার হাতের তালুটা কেমন ঘামছে। ভয়? না, ঠিক ভয় নয়, একটা তীব্র অস্বস্তি, যা গত তিন মাস ধরে তাকে প্রতিটা মুহূর্তে ক্ষয় করে চলেছে।

এই অফিসের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মেঘা। আর ঠিক চারটে কিউবিকল পরেই বসেন তাদের নতুন প্রোজেক্ট হেড, বিক্রম।

বিক্রম কোনোদিন মেঘাকে একটাও খারাপ কথা বলেননি। কোনো অশালীন মেসেজ পাঠাননি, গায়ে হাত দেওয়া তো দূরের কথা। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিক্রমের উপস্থিতি মেঘার কাছে একটা অদৃশ্য হিংস্রতার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। একেই বলে ‘নন-ভারবাল হ্যারাসমেন্ট’—যা চোখে দেখা যায়, কিন্তু প্রমাণ করা যায় না।

বিক্রমের অত্যাচারটা নীরব। মেঘা যখনই কোনো মিটিংয়ে কথা বলতে ওঠে, বিক্রম তার চোখের দিকে তাকান না; তার দৃষ্টি নেমে যায় মেঘার শরীরের খাঁজে। সেই তীব্র, আঠালো চাউনি মেঘার চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যায়। মেঘা কুঁকড়ে যায়, গায়ের ওড়না বা ওয়ান-পিসটা আরও একটু টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বিক্রমের মুখে তখন একটা সূক্ষ্ম, ধূর্ত হাসি লেগে থাকে।

কখনও কখনও মেঘা যখন কফি মেশিনের সামনে দাঁড়ায়, বিক্রম এসে ঠিক তার গা ঘেঁষে দাঁড়ান। কোনো ছোঁয়াচ নেই, কিন্তু মেঘা স্পষ্ট টের পায় বিক্রমের নিঃশ্বাসের গরম হাওয়া। সে সরে যেতে চাইলে বিক্রম খুব স্বাভাবিক গলায় বলেন, “আরে মেঘa, কালকের ফাইলটা রেডি তো?” এমন একটা ভাব, যেন কিছুই হয়নি। এই ‘প্লাসবল ডিনায়াবিলিটি’ বা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগটাই বিক্রমের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মেঘা যদি প্রতিবাদ করে, বিক্রম হেসে বলবেন, “আপনি বড্ড ওভার-রিয়্যাক্ট করছেন!”

আজ আর পারল না মেঘা। সন্ধেবেলা যখন সবাই চলে গেছে, সে নিজের কেবিনে একা বসে ফাইল গোছাচ্ছিল। হঠাত্‍ বিক্রম তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কোনো কথা না বলে, টেবিলের ওপর দুই হাত দিয়ে ঝুঁকে এলেন মেঘার দিকে। দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চির। বিক্রমের চোখে সেই পরিচিত, শিকারী চাউনি। মেঘার মনে হলো ঘরের ভেতরের সমস্ত অক্সিজেন যেন ফুরিয়ে আসছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, কাঁপানো গলায় বলল, “আই নিড টু গো, স্যার।” বিক্রম এক চুলও নড়লেন না, শুধু সেই ধূর্ত হাসিটা হেসে পথ ছেড়ে দিলেন।

বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেঘা দেখল, তার চোখ দুটো লাল। সে কি চাকরিটা ছেড়ে দেবে? কত কষ্ট করে এই পজিশনটা পেয়েছে সে। কিন্তু এই রোজকার মানসিক ট্রমা আর কতদিন? এইচআর-এর কাছে গেলে তারা প্রমাণ চাইবে। কোনো সিসিটিভি ফুটেজে তো একটা চাউনি বা কয়েক ইঞ্চি দূরত্বের অভিসন্ধি ধরা পড়ে না!

পরদিন সকালে মেঘা অফিসে ঢুকল একটা নতুন শক্তিতে। সে বুঝল, নীরবতা অপরাধীর সাহস বাড়ায়। সে সোজা গেল অফিসের সিনিয়র ডিরেক্টর শর্মিলা বোসের কেবিনে। শর্মিলা দেবী একজন অভিজ্ঞ মহিলা।

মেঘা কোনো রাখঢাক না করে বলল, “ম্যাম, আমি কোনো লিখিত অভিযোগ করতে আসিনি, কারণ আমার কাছে কোনো টেক্সট বা অডিও প্রমাণ নেই। কিন্তু আমি একটা ‘টক্সিক ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট’-এর কথা জানাতে এসেছি।” মেঘা বিক্রমের নাম না করে শুধু তার আচরণগুলো, সেই লিঙ্গারিং গেজ (আঠালো চাউনি) আর স্পেশাল ইনট্রুশন (শরীরের বড্ড কাছে চলে আসা)-এর নিখুঁত বিবরণ দিল।

শর্মিলা দেবী শান্ত হয়ে শুনলেন। তিনি মেঘার চোখের ভাষা পড়তে পারলেন। তিনি বললেন, “মেঘা, তুমি একা নও। এই নীরব হিংস্রতা অনেকেই সহ্য করে। তুমি মুখ খুলেছ, এটাই অনেক।”

ঠিক তার পরের সপ্তাহে অফিসে একটা বড় পরিবর্তন হলো। শর্মিলা দেবীর উদ্যোগে পুরো অফিসের সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট বদলে দেওয়া হলো, বিক্রমের কেবিনের কাচ স্বচ্ছ করে দেওয়া হলো যাতে বাইরে থেকে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, পুরো অফিসের জন্য একটা বাধ্যতামূলক ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড প্রফেশনাল বাউন্ডারিজ’ (শারীরিক ভাষা ও পেশাদারী সীমানা) সংক্রান্ত ওয়ার্কশপ করা হলো, যেখানে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হলো—অশালীন ইঙ্গিত বা চাউনিও অপরাধের শামিল।

পরের মিটিংয়ে বিক্রম যখন আবার মেঘার দিকে সেই চাউনি দিতে গেলেন, মেঘা এবার আর চোখ সরিয়ে নিল না বা কুঁকড়ে গেল না। সে সোজা বিক্রমের চোখের দিকে তাকাল—অত্যন্ত কঠোর, আত্মবিশ্বাসী এবং স্থির দৃষ্টিতে। বিক্রম নিজেই এবার অস্বস্তিতে পড়ে চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলেন।

কাচের জানলা দিয়ে আবার রোদ এসে পড়ল মেঘার টেবিলে। এবার আর তার হাতের তালু ঘামছিল না। মেঘা বুঝল, কর্পোরেট দুনিয়ায় মেয়েদের লড়াইটা শুধু কাজ দিয়ে নয়, নিজের চারপাশের অদৃশ্য সীমানাটাকে শক্ত করে ধরে রাখার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

Related Articles

The Modern Trap of Empty Calories :: Subhra Banerjee

Views: 82 *পুষ্টিহীন ক্যালোরির আধুনিক ফাঁদ* শুভ্রা ব্যানার্জী, শিক্ষিকা,বেলতলা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (উঃ মাঃ)   বর্তমান যুগে আমরা অনেকেই পুষ্টিহীন ক্যালোরির ফাঁদে আসক্ত যা উচ্চক্যালোরি…

সম্পাদকীয়: এক অপরাজেয় রূপকথা—ডঃ বুশরা বানো ও বাংলার মেয়েদের ডানার উড়ান

Views: 41 সম্পাদকীয়: এক অপরাজেয় রূপকথা—ডঃ বুশরা বানো ও বাংলার মেয়েদের ডানার উড়ান একটি মেয়ে, যার কোলে তখন সদ্যোজাত শিশু। শরীরে অস্ত্রোপচারের তীব্র যন্ত্রণা। চারপাশের…